Monday, October 19, 2015

বেদনার রঙ কি নীল ? -আপেল মাহমুদ

দুইটা ঘটনা শোনাই।
প্রথম ঘটনাটা ঘটছে গত সোমবার বিকেলে। বড়লোকের ১৬ বছরের এক ছেলে কার রেসিং করছিল। শুধু কার রেসিং করছিল তা নয়, মাঝে মাঝে সেলফি তুলছিল আর রেসটা কখনো কখনো ভিডিও ও করছিল। ঝড় তোলা সেই রেসের বিভিন্ন ছবিও ম্যাসেজিংয়ের মাধ্যমে পাঠাচ্ছিল বন্ধুদের। ১৬ বছরের এই ছেলে আবার মদ্যপ ছিল. শিভাস রিগ্যাল খেয়ে অস্থির অবস্থা। সে এক দুর্দান্ত রেসিং। তবে তার এই রেসটা কোন খোলা মাঠের নয়, হচ্ছিল গুলশানের রাস্তায়।
সেই রাস্তা দিয়ে রিকশায় করে যাচ্ছিল এক মা, আর কোলে ছিল মায়ের ফুটফুটে এক শিশু। ১৬ বছরের সেই রেসিং হিরো তার গাড়িটা গিয়ে তুলে দিল ঐ রিকশার উপর। রিকশা দুমরে মুচরে একাকার। সাথে সাথে রিকশায় বসে থাকা মায়ের কোলের শিশুটি মরে গেল।
'এরকম একটা ঘটনায় পুলিশ আসবে সেটাই স্বাভাবিক। পুলিশ এলো। তারপর বড়লোকের ঐ ১৬ বছরের শিশুটিকে ধরে নিয়ে গেল।' কি এরকমটাইতো হবার কথা নাকি? কিন্তু তা হলনা। পুলিশ এলো ঠিকই বড়লোকের সেই আদুরে ছেলেকে ধরার জন্য নয়, মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে সেইফলি বাসায় পৌছে দেবার জন্য। হুম, কারন ঐ ১৬ বছরের মদ্যপ ছেলেটির চাচা ক্ষমতাসীন দলের একজন সাংসদ।
এবার দুই নাম্বার ঘটনাটা শোনাই।
এই ঘটনাটা বলার আগে একটু পেছনে যেতে হচ্ছে। আরিফ-জাকিয়া-হাসিব-শুভ নামের কয়েকজন স্বপ্নবান তরুন মিলে তৈরী করল একটা মজার স্কুল। হ্যাঁ, স্কুলের নামই মজার স্কুল। এই স্কুলে পড়ে পথশিশুরা। স্বপ্নবান তরুনরা শাহবাগ, গুলিস্তান, সায়দাবাদ সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পথশিশুদের নিয়ে আসে এই স্কুলে। তারপর নিজেদের সময় আর টিফিনের পয়সা বাচিয়েঁ এই পথশিশুগুলোকে পড়াশোনা করায়। খাতা, কলম, পেন্সিল কিনে দেয়। ঈদের সময় সাধ্যমত জামা কাপড় কিনে দেয়। আমের সিজনে অন্তত একদিন পেট ভরিয়ে আম খাওয়ানোর চেষ্টা করে। আর নিজেরা পথশিশুদের মুখের হাসি দেখেই তৃপ্ত হয়।
এবার ঘটনাটা বলি। প্রায় এক মাস আগের ঘটনা। পুলিশ কয়েকজন তরুন-তরুনীকে গ্রেফতার করল শিশু পাঁচারকারীর অভিযোগে। তাদেরকে মিডিয়ার সামনে অপরাধীর মত দাঁড় করানো হল। দেখে মনে হল পুলিশ বিশাল এক চক্রকে ধরে ফেলে অসীম কৃতিত্বের কাজ করে ফেলেছে। কিন্তু হায়, এরা তো সেই মজার স্কুলের স্বপ্নবান তরুন আরিফ-জাকিয়া-হাসিব-শুভ! কী মস্ত বড় ভুল!
দুটো ঘটনা পাশাপাশি ভাবতেই কষ্ট লাগছে। একদিকে ক্ষমতাসীন ব্যক্তির ১৬ বছরের খুনি ভাতিজাকে বাঁচানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা আর অন্যদিকে কয়েকজন স্বপ্নবান তরুনকে মিথ্যে অভিযোগে আটকে রাখা। একদিকে আটকে থাকা ছেলেমেয়েগুলোর ফাইনাল পরীক্ষা দিতে না পারার আশংকা আর অন্যদিকে ১৬ বছরের মদ্যপ ছেলেটার বেঁচে যাওয়া। একদিকে আরিফ-জাকিয়া-হাসিব-শুভদের হারিয়ে অঝোরে কাঁদছে পথশিশুগুলো আর অন্যদিকে বড়লোকের ছেলের ভুলের জন্য সন্তান হারিয়ে কাঁদছে মা।
আমি ৫৭ ধারাকে রেসপেক্ট করি, তাই মুখে আমার গালি আসেনা।

No comments:

Post a Comment